পার্বত্য বাংলায় ইসলাম

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের প্রায় এক-দশমাংশ পার্বত্য অঞ্চলের প্রশাসনিক জেলা রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি। নৃতাত্ত্বিক, ভৌগোলিক পর্যটনে জেলাগুলো বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। বাঙালিরা ব্যবসায়-বাণিজ্য, জীবিকায়ানের স্বার্থে মোঘল ও ব্রিটিশ আমল হতে এখানে বসবাস করছেন।

পার্বত্যত্রিপুরা ও আরাকানিদের মধ্যেই এ অঞ্চলের কর্তৃত্ব আবর্তীত হতো। ৯৫৩ সালে আরাকানের রাজা এ অঞ্চল অধিকার করেন। সুলতান ফখরুদ্দিন মুবারক শাহ (১৩৩৮- ৪৯) চট্টগ্রাম ও পার্বত্য অঞ্চলে মুসলিম আধিপত্য নিশ্চিত করেন। ১৫৫০ সালে প্রকাশিত বঙ্গের প্রথম মানচিত্রে অঞ্চলটির উল্লেখ আছে। মোঘলরা ১৬৬৬- ১৭৬০ পর্যন্ত অঞ্চলটি সুবা বাংলার অধীনে শাসন করেন। ১৭৬০ সালে অঞ্চলটির কর্তৃত্ব নেয় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। ‘চিটাগাং হিল ট্র্যাক্টস’ নামে ব্রিটিশরা ১৮৬০ সালে স্বতন্ত্র জেলা প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৪৭ সালে অঞ্চলটি পাকিস্তানের এখতিয়ারভুক্ত এবং ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়।

এ অঞ্চলে বাঙালি মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। উপজাতিদের মধ্যেও আছেন ধর্মান্তরিত মুসলমান। বাঙালিদের মধ্যে মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, কিছু ধর্মান্তরিত খ্রিস্টানও আছেন। এখানে বাঙালি ছাড়াও চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, ম্রো বা মুরং, তঞ্চঙ্গ্যা, বোম, পাংখোয়া, চাক, খুমি, লুসাই বা মিজো, কুকি বা চিন জনগোষ্ঠীর বসবাস আছে।

পার্বত্য বাংলায় ইসলাম 

রাঙ্গামাটি 
নৈসর্গিক লীলাভূমি ও পার্বত্যাঞ্চলের রাজধানীখ্যাত রাঙ্গামাটি, রিকশামুক্ত জেলা। ২০১১ সালের জনশুমারি মোতাবেক জনসংখ্যা ৬,২০,২১৪ জন। আয়তন ৬১১৬.১৩ ব.কিমি। উপজেলা ১০টি, থানা ১২টি। পৌরসভা ০২টি, ইউনিয়ন ৫০টি, গ্রাম ১৩৪৭টি। শিক্ষার হার ৪৩.৬০ শতাংশ। জেলায় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর অধিকাংশ বৌদ্ধ, কিছু সংখ্যক হিন্দু ও খ্রিস্টান। বাঙালিদের বেশির ভাগ মুসলমান।

রাঙ্গামাটির অন্যতম মসজিদ
ইসলামপুর জামে মসজিদ, পুরানা বস্তি জামে মসজিদ, তৈয়বিয়া জামে মসজিদ, নিউ রাঙ্গামাটি জামে মসজিদ, সওজ জামে মসজিদ, পুরাতন কোর্ট বিল্ডিং জামে মসজিদ, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড জামে মসজিদ, বায়তুশ শরফ জামে মসজিদ, ডিসি বাংলো জামে মসজিদ, পুলিশ লাইন জামে মসজিদ, কাশেম বাজার জামে মসজিদ, বায়তুল আমান জামে মসজিদ, ফরেস্ট অফিস কমপ্লেক্স জামে মসজিদ, আনসার ভিডিপি জামে মসজিদ, টিএন্ডটি জামে মসজিদ, সদর থানা জামে মসজিদ, বাইতুস সালাম জামে মসজিদ, কোর্ট জামে মসজিদ, হাসপাতাল জামে মসজিদ, বনরূপা জামে মসজিদ, ব্রিগেড জামে মসজিদ, রিজার্ভমুখ জামে মসজিদ ইত্যাদি।

রাঙামাটির মসজিদগুলোর অন্যতম ‘পুরাতন রাঙামাটি জামে মসজিদ’। বাংলাদেশের সর্বোচ্চস্থানে নির্মিত ‘দারুস সালাম জামে মসজিদ’ রাঙ্গামাটির সাজেক ভ্যালির রুইলু্পাড়ায় অবস্থিত। 

খাগড়াছড়ি
খাগড়াছড়ির আয়তন ২,৬৯৯.৫৬ ব.কিমি। ২০২২-এর জনশুমারি মোতাবেক জনসংখ্যা ৭১৪,১১৯ জন। উপজেলা ০৯টি। পৌরসভা ৩টি, ইউনিয়ন ৩৮টি। মসজিদ ৬৩৪টি, বৌদ্ধমন্দির (ক্যাং) ৮৩৬টি, হিন্দুমন্দির ২১২টি, গীর্জা ২৬৬টি। শিক্ষার হার ৭১.৮০ শতাংশ।

খাগড়াছড়ির অন্যতম মসজিদ
বিজিবি ক্যাম্প মসজিদ, সিঙ্গিনালা মসজিদ, জেলা পরিষদ মসজিদ, টার্মিনাল মসজিদ, উপজেলা মসজিদ, খেজুর বাগান মসজিদ, সবুজবাগ মসজিদ, এমইএস মসজিদ, আর্মি জোন মসজিদ, ব্রিগেড মসজিদ, টিলা মসজিদ, আনসার ক্যাম্প মসজিদ, বাঙ্গালকাটি মসজিদ, চেঙ্গী ব্রিজ মসজিদ, বায়তুশ শরফ মসজিদ, মুসলিমপাড়া মসজিদ, পুরাতন পুলিশ লাইন মসজিদ, কলাবাগান মসজিদ, কোর্টবিল্ডিং মসজিদ, সদর থানা মসজিদ, ইসলামপুর মসজিদ, দারুল আইতাম মসজিদ, দারুল উলুম মসজিদ, নতুন পুলিশ লাইন মসজিদ, গারাংগিয়া মসজিদ, মধ্য শালবন মসজিদ, ওয়াপদাপাড়া মসজিদ, বাজার শাহি মসজিদ, নয়নপুর মসজিদ, জেলা পরিষদ মার্কেট মসজিদ, গাউছিয়া জামে মসজিদ, এপিবিএন জামে মসজিদ, এপিবিএন ব্যাটালিয়ন মসজিদ ইত্যাদি।

বান্দরবান
বান্দরবানের আয়তন ৪৪৭৯.০২ ব.কিমি। জেলায় ৭টি উপজেলা, ২টি পৌরসভা, ৩৩টি ইউনিয়ন, ১৪৮২টি গ্রাম রয়েছে। শিক্ষার হার ৫৩.৫৪ শতাংশ। আছে বিশ্ববিদ্যালয় ১টি, কলেজ ৬টি, মাদ্রাসা ৮টিসহ অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
জনসংখ্যার ৫২.৬৮ শতাংশ মুসলিম, ৩.৪২ শতাংশ হিন্দু, ২৯.৫২ শতাংশ বৌদ্ধ এবং ৯.৭৮ শতাংশ খ্রিস্টান ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বী।

বারন্দবান সদরের অন্যতম মসজিদ
বান্দরবান কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ, বান্দরবান বাজার জামে মসজিদ, গোরস্থান মসজিদ, স্টেডিয়াম জামে মসজিদ, বনরূপা জামে মসজিদ, বালাঘাটা জামে মসজিদ, বান্দরবান থানা জামে মসজিদ, আর্মিপাড়া জামে মসজিদ, কালেক্টরেট স্কুল জামে মসজিদ, হাফেজ ঘোনা জামে মসজিদ, ইসলামপুর জামে মসজিদ, লাঙ্গিপাড়া কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ, বান্দরবান বাসস্ট্যান্ড মসজিদ, নিউ গুলশান জামে মসজিদ, উজানীপাড়া জামে মসজিদ, মধ্যপাড়া জামে মসজিদ, লালমোহন  জামে মসজিদ, নতুনপাড়া বাজার জামে মসজিদ, কেচিংঘাটা মসজিদ, ক্যান্টনমেন্ট জামে মসজিদ, কলেজ জামে মসজিদ ইত্যাদি।

বান্দরবানের ওমর ফারুক ত্রিপুরা ২০১৪ সালে মুসলমান হন। তাঁর প্রচেষ্টায় ৩০টি পরিবার মুসলমান হন। তিনি নিজ উদ্যোগে মসজিদ তৈরী করে ইমামতি শুরু করেন।
শান্তি মানবতার শত্রু কতিপয় অপশক্তির ইন্ধনে ১৮ জুন, ২০২১ ইসলামের নিবেদিত প্রাণসৈনিক ওমর ফারুক ত্রিপুরাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান 
ইসলামিক স্টাডিজ, কাপাসিয়া ডিগ্রি কলেজ
কাপাসিয়া, গাজীপুর। 
prof.ershad92@gmail.com

তথ্যঋণ ও কৃতজ্ঞতা
জাতীয় তথ্য বাতায়ন, বাংলাপিডিয়া, উইকিপিডিয়া ও অন্যান্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *