
১৯ অক্টোবর ২০২৪। উত্তর গাজার বেইত লাহিয়ার হামাদ স্কুল। যুদ্ধের থাবায় বিধ্বস্ত শত শত ফিলিস্তিনি এখানে আশ্রয় নিয়েছিল ভেবে নিরাপদে আছে। ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই ইসরায়েল ট্যাঙ্ক ঘিরে ফেলে স্কুল। আকাশে ভেসে থাকা কোয়াডকপ্টার থেকে আরবিতে নির্দেশ ভেসে আসে— সবাই বাইরে আসুন, পরিচয়পত্র দেখান, হাত উপরে তুলুন।
ত্রিশ বছর বয়সী আমাল আল-মাসরির বুকের ধুকপুকানি বেড়ে যায়। তার কোলে নবজাতক মেয়ে, যার এখনও নামকরণ হয়নি। সারারাত গোলাবর্ষণ, বিস্ফোরণের শব্দে কেউ চোখের পাতা এক করতে পারেনি। আমাল, তার স্বামী ইউসুফ (৩৬), তাদের পাঁচ সন্তান—তালা, হোন্দা, আসাদ, ওমর (৪-১১ বছর বয়সী) এবং ইউসুফের বাবা জামিল (৬২) স্কুলের নিচতলার একটি কক্ষে আশ্রয় নিয়েছিলেন।
কোয়াডকপ্টারের নির্দেশে পুরুষদের স্কুল গেটে, নারী-শিশুদের প্রাঙ্গণে জড়ো করা হয়। ইউসুফসহ অন্য পুরুষদের ক্যামেরায় রেকর্ড করে একটি গর্তের মতো জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়। হাত পিছমোড়া করে বেঁধে সারাদিন হাঁটু গেড়ে বসে থাকতে হয় তাদের। ইসরায়েল সেনারা গুলি চালায়, সাউন্ড বোমা ফেলে, নির্যাতন করে।

সন্ধ্যায় ইউসুফসহ দুজনকে একটি অ্যাপার্টমেন্টে নিয়ে যাওয়া হয়। পরদিন তাকে মানব ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে স্কুল তল্লাশি করানো হয়। প্রতি মুহূর্তে মৃত্যুভয় তাড়া করে ফিরছিল ইউসুফকে।
চতুর্থ দিনে ইউসুফ ও আরেকজনকে কামাল আদওয়ান হাসপাতালে আশ্রয়প্রার্থীদের সরে যাওয়ার নির্দেশ সংবলিত লিফলেট বিলি করতে বলা হয়। ইউসুফ পালানোর সুযোগ খোঁজে। হাসপাতাল প্রাঙ্গণে লুকিয়ে থাকার সময় ট্যাঙ্কের উপর বসে থাকা এক সেনার গুলিতে তার পা-এ আঘাত লাগে। আহত অবস্থায় আল-আহলি আরব হাসপাতালে নেওয়া হলে তার পা-এ ১৩টি সেলাই দেওয়া হয়।
এদিকে, আমাল ও তার সন্তানরা পশ্চিম গাজার নিউ গাজা স্কুলে আশ্রয় নেয়। সেখানেই ইউসুফ তার পরিবারের সঙ্গে পুনর্মিলিত হন। নবজাতক মেয়ের নাম রাখা হয় ‘সুমুদ’—যার অর্থ অটলতা।
পরিবারের অন্য সদস্যদের খুঁজে পেলেও বাবা জামিলের কোনো খবর পাননি ইউসুফ। কিছু লোক বলেছে তাকে বন্দী করা হয়েছে, কিন্তু ইউসুফ এ ব্যাপারে নিশ্চিত নন।
ইউসুফের গল্প গাজার বর্বরতার একটি প্রতীক। হাজার হাজার ফিলিস্তিনি এমন ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে বেঁচে আছে। গাজার ইসরায়েল হামলায় নিহত প্রায় ৫০ হাজার মানুষের মধ্যে অনেকেই হয়তো এমন কাহিনি বলার সুযোগ পায়নি।
আল-জাজিরা অবলম্বনে