
ঝিনাইদহ জেলার কালীগঞ্জ উপজেলাধীন বারবাজার মুসলিম ইতিহাসের এক সমৃদ্ধ রত্নভাণ্ডার। এখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে মুসলিম শাসনামলের বহু প্রত্নতাত্ত্বিক মণি-মাণিক্য। তেমনি একটি মূল্যবান ঐতিহাসিক রত্নের নাম জোড়া বাংলা মসজিদ। অপূর্ব কারুকাজ ও মনোহর নকশার জন্য এই মসজিদকে মুসলিম স্থাপত্যশিল্পের অনন্য নিদর্শন মনে করা হয়। এর নির্মাণশৈলীর সঙ্গে সুলতানি আমলের আরো কয়েকটি মসজিদের মিল রয়েছে। খনন কাজের সময় ভগ্ন পোড়া মাটির শিলালিপি পাওয়া যায়। শিলালিপি অনুসারে মসজিদটি নির্মাণ করেন আবুল মুজাফফর মাহমুদ ইবনে হুসাইন, এটা সুলতান গিয়াসউদ্দিন মাহমুদের অপর নাম বলে অনুমান। তিনি ১৫৩৩ থেকে ১৫৩৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বাংলার শাসক ছিলেন।
জোড় বাংলা মসজিদটি জোড়া ঢিবি মসজিদ নামেও পরিচিত। মসজিদের এই নামকরণের সঠিক কোনো কারণ জানা যায় না। তবে স্থানীয় জনশ্রুতি অনুসারে বহুকালে পূর্বে মসজিদের পাশে এক জোড়া কুঁড়ে ঘর ছিল বলে মসজিদের এই নাম হয়েছে। আবার কেউ কেউ বলেন, মসজিদের পাশে থাকা জোড়া দিঘির কারণে মসজিদের নাম জোড় বাংলা হয়েছে। ঐতিহাসিক এই মসজিদ দীর্ঘকাল ঝোপ-জঙ্গলের ভেতর মাটির নিচে চাপা পড়ে ছিল। ১৯৯২-৯৩ সালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর খননের মাধ্যমে মসজিদটি আবিষ্কার করে। মসজিদটি এখন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে সংরক্ষিত। তবে এখানে নিয়মিত নামাজ হয়। আবিষ্কারের সময় জোড় বাংলা মসজিদ ছিল প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত। মসজিদের গম্বুজও প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। পরবর্তীতে তা পুনর্নির্মাণ করা হয়।
জোড় বাংলা মসজিদের প্রধান প্রবেশ-তোরণ ছিল উত্তর-পূর্ব দিকে। তোরণ থেকে একটি ইটের তৈরি পাকা রাস্তা দীঘি বা পুকুরের সঙ্গে মিলিত হয়েছে। মসজিদটি ১১ ফুট উঁচু ভিতের ওপর স্থাপিত। ভিতটির আয়তন উত্তর-দক্ষিণে ৫৪ দশমিক আট মিটার এবং পূর্ব-পশ্চিমে ৫১ দশমিক ৭৬ মিটার। মসজিদের বহির্ভাগের পরিমাপ উত্তর-দক্ষিণে সাত দশমিক ৮৫ মিটার এবং পূর্ব-পশ্চিমে সাত দশমিক ৯০ মিটার। অভ্যন্তর ভাগের পরিমাপ উত্তর-দক্ষিণে ছয় দশমিক ৪৩ মিটার এবং পূর্ব-পশ্চিমে ছয় দশমিক ৪৫ মিটার। মসজিদের পূর্বদিকে কৌণিক খিলানযুক্ত তিনটি প্রবেশপথ আছে। মাঝের প্রবেশপথটি অপেক্ষাকৃত বড়। উত্তর ও দক্ষিণের দেয়ালে কৌণিক খিলানযুক্ত দুটি বদ্ধ খাঁজ রয়েছে।
জোড় বাংলা মসজিদের পশ্চিম দেওয়ালে তিনটি অর্ধবৃত্তাকার মিহরাব আছে। মাঝেরটি অপেক্ষাকৃত বড় এবং এর অভ্যন্তরে শিকল ঘণ্টার বিমূর্ত অলঙ্করণ রয়েছে। মিহরাবটি বাইরের দিকে উদ্গত। মিহরাবগুলো প্যানেল ও বন্ধনী দ্বারা অলঙ্কৃত। মিহরাবগুলোর দুই পাশে একটি করে ক্ষুদ্র স্তম্ভ আছে। মিহরাবগুলো আয়তাকার ফ্রেমে আবদ্ধ। মসজিদের গাঁথুনিতে চুন ও বালি ব্যবহূত হয়েছে।
মসজিদের বাইরের দিকে চার কোনায় আনুভূমিক বন্ধনীযুক্ত অষ্টভুজাকৃতির চারটি বুরুজ আছে। উত্তর-পূর্ব কোনার বুরুজে পত্র-পল্লবের অলঙ্করণ দেখা যায়। মসজিদের বাইরের দেওয়ালে পর্যায়ক্রমে স্থাপিত অফসেট ও রিসেস দেখা যায়। মসজিদের পাশেই আছে সুলতান মাহমুদ শাহের শাসনামলে খননকৃত অন্ধপুকুর দিঘী। ধারণা করা হয়, মসজিদ নির্মাণের সময় তিনিই মুসল্লিদের পবিত্রতা অর্জন এবং স্থানীয় জনসাধারণের পানির ব্যবস্থা করতে দীঘি খনন করেন।
ইসলামী স্থাপত্যশৈলী ও চারুকলার অনন্য নিদর্শন জোড় বাংলা মসজিদ। দীর্ঘ মাটির নিচে চাপা থাকা এবং কালক্রমে নকশা ও কারুকাজের অনেকটাই নষ্ট হয়ে যাওয়ার পরও মসজিদের দেয়ালে দেয়াল এখনো তার কিছু নিদর্শন রয়ে গেছে। তাই তো প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ভ্রমণপ্রিয় মানুষ মসজিদটি দেখতে আসে।
হাবিবা আক্তার