পূণ্য রজনীতেও যারা আল্লাহর ক্ষমা থেকে বঞ্চিত

হাদিসের আলোকে শবেবরাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রজনী। এ রাতের ইবাদতও ফজিলতপূর্ণ। হাদিসের ভাষ্যমতে, এ রাতে অনেককে ক্ষমা করা হয়। তবে কিছু দুর্ভাগা ব্যক্তি রয়েছে, যারা এই বিশেষ রজনীতেও ক্ষমাপ্রাপ্তির নিয়ামত থেকে বঞ্চিত হবে।

তবে যদি তারা তাওবা করে এবং আল্লাহ তাআলার কাছে আন্তরিকভাবে ক্ষমা চায়, তাহলে তিনিও তাদের ক্ষমা করবেন। এমন কয়েকজন দুর্ভাগা হলো—
১. মুশরিক

যে ব্যক্তি শিরকের মতো ঘৃণিত পাপে লিপ্ত থাকবে, শবেবরাতেও আল্লাহ তাআলা তাকে ক্ষমা করবেন না। পবিত্র কোরআনে তিনি বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাকে ক্ষমা করেন না, যে তার সঙ্গে শিরক করে। এর চেয়ে নিম্নস্তরের পাপ তিনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন। (সুরা : নিসা, আয়াত : ৪৮)

২. মুশাহিন

মুশাহিন অর্থ বিদ্বেষ পোষণকারী। দ্বিনি কোনো কারণ ছাড়া যে ব্যক্তি অন্যের প্রতি অন্তরে বিদ্বেষ লালন করবে, আল্লাহ তাআলা তাকে এ রাতে ক্ষমা করবেন না। ইমাম আওজায়ি (রহ.) বলেন, মুশাহিন হচ্ছে সেই ব্যক্তি, যে সাহাবিদের প্রতি অন্তরে বিদ্বেষ লালন করে। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, বিদ্বেষ পোষণকারী দুই ব্যক্তি পারস্পরিক সন্ধি করার আগ পর্যন্ত তাদের ক্ষমা করা হবে না।(সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৫৬৫)

৩. হত্যাকারীকাউকে হত্যা করা

কুফরের সমপর্যায়ের অপরাধ। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোনো মুসলমানকে গালি দেওয়া জঘন্য পাপ, আর কোনো মুসলমানকে হত্যা করা কুফরি।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৭০৭৬)

এ ছাড়া হত্যা সেই সাতটি ধ্বংসাত্মক পাপের অন্তর্ভুক্ত, যেগুলো সম্পর্কে হাদিসে সতর্ক করা হয়েছে। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২৭৬৬) হত্যাকারীর পাপ শবেবরাতেও ক্ষমা করা হবে না। হজরত আবু দারদা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আশা করা যায়, সব গুনাহই আল্লাহ তাআলা ক্ষমা করবেন, তবে যে ব্যক্তি মুশরিক অবস্থায় মৃত্যুবরণ করল অথবা ঈমানদার কোনো মুমিনকে ইচ্ছাকৃত হত্যা করল, তাদের ক্ষমা করা হবে না।(সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস : ৫৯৮০)


৪. সম্পর্ক ছিন্নকারী

আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা কবিরা গুনাহ। যারা এমন কাজ করে, তাদের ওপর আল্লাহ তাআলার অভিসম্পাত থাকে। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আর ক্ষমতা লাভ করলে সম্ভবত তোমরা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করবে। এদের প্রতিই আল্লাহ তাআলা অভিসম্পাত করেন…।’ (সুরা : মুহাম্মদ, আয়াত : ২২-২৩)

হাদিসে হজরত জুবায়ের ইবনে মুতইম (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫৯৮৪)

আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী ব্যক্তির কোনো আমল আল্লাহ তাআলার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। তাই শবেবরাতসহ অন্যান্য ফজিলতপূর্ণ রাতে এমন ব্যক্তির ক্ষমাপ্রাপ্তির সুযোগ থাকে না। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘প্রতি বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে আদম সন্তানের আমল আল্লাহর দরবারে উপস্থাপন করা হয়। তখন আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারীর আমল গ্রহণ করা হয় না।’ (আদাবুল মুফরাদ, হাদিস : ৬১)

৫. টাখনুর নিচে কাপড় পরিধানকারী

পুরুষদের জন্য টাখনুর নিচে কাপড় পরিধান করা নাজায়েজ। এটি অহংকারের প্রতীক, যা শরিয়তে নিষিদ্ধ। অহংকারবশত যে ব্যক্তি টাখনুর নিচে কাপড় ঝুলিয়ে রাখবে, তার জন্য কঠোর শাস্তির কথা হাদিসে উল্লেখ রয়েছে। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি অহংকারের কারণে কাপড় ঝুলিয়ে চলবে, আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিনে তার দিকে দৃষ্টি দেবেন না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩৬৬৫)

অন্য হাদিসে হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘টাখনুর যে অংশ কাপড় দ্বারা আবৃত থাকবে, তা জাহান্নামে যাবে।’ (সুনানে নাসায়ি, হাদিস : ৫৩৩১)

এ ছাড়া পিতামাতার অবাধ্য সন্তান, জিনা-ব্যভিচারে লিপ্ত ব্যক্তি এবং নেশাগ্রস্তরাও শবেবরাতে ক্ষমা লাভের সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত হবে। তবে যদি কেউ স্বীয় পাপের জন্য অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা ও তাওবা করে এবং ভবিষ্যতে এসব পাপে লিপ্ত না হওয়ার অঙ্গীকার করে, তাহলে আল্লাহ তাআলা তাকে ক্ষমা করবেন। কারণ তাওবার মাধ্যমে সব গুনাহ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তবে কেউ তাওবা করলে, ঈমান আনলে এবং সত্কর্ম করলে, আল্লাহ এরূপ লোকদের পাপরাশিকে পুণ্যে পরিবর্তন করে দেবেন। আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা : ফুরকান, আয়াত : ৭০)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *