
২০২৪ সাল ছিল বাংলাদেশের হাফেজদের জন্য এক অবিস্মরণীয় বছর। বিশ্বের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক হিফজুল কোরআন প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের হাফেজরা কোরআনের প্রতি তাদের অঙ্গীকার, গভীর জ্ঞান এবং প্রতিভার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। মক্কা থেকে কায়রো, তুরস্ক থেকে ইরান ও সেনেগাল—প্রতিটি প্রতিযোগিতায় তাদের অংশগ্রহণ এবং বিজয় বাংলাদেশের গৌরবকে বহুগুণ বৃদ্ধি করেছে।
এই বছর আন্তর্জাতিক মঞ্চে ছয়জন বাংলাদেশি হাফেজ শীর্ষ স্থান অর্জন করে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন দেশের মর্যাদা। আসুন, জেনে নিই তাদের অনন্য সাফল্যের গল্প।
তুরস্কে শীর্ষে মুয়াজ মাহমুদ
তুরস্কে অনুষ্ঠিত নবম আন্তর্জাতিক হিফজুল কোরআন প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের হাফেজ মুয়াজ মাহমুদ প্রথম স্থান অধিকার করেন। রাজধানীর মিরপুর-১ এর মারকাযু ফয়জিল কোরআন আল ইসলামি মাদ্রাসার এই শিক্ষার্থী ৩০ অক্টোবর তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের হাত থেকে পুরস্কার গ্রহণ করেন।
এর আগে, মক্কায় ৪৪তম আন্তর্জাতিক হিফজুল কোরআন প্রতিযোগিতায় ১৫ পারা গ্রুপে প্রথমস্থান অর্জন করেন মুয়াজ। তুরস্কে বিজয়ের পর জনতা তাকে ছাদখোলা বাসে সংবর্ধনা জানায়। ২০১৬ সালের পর তুরস্কের প্রতিযোগিতায় আবারও শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট ছিনিয়ে এনেছে বাংলাদেশ।
মক্কায় তৃতীয় সালেহ আহমদ তাকরিম
১১১ দেশের মধ্যে কিশোর হাফেজ সালেহ আহমদ তাকরিম সৌদি আরবের মক্কায় অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক কোরআন প্রতিযোগিতার চতুর্থ শাখায় তৃতীয় স্থান অর্জন করেন। শুদ্ধ উচ্চারণসহ ১৫ পারা মুখস্থ প্রতিযোগিতায় তাকরিমকে ১ লাখ সৌদি রিয়াল পুরস্কৃত করা হয়, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় সাড়ে ২৭ লাখ টাকা।
এর আগে, ইরানে আন্তর্জাতিক হিফজ প্রতিযোগিতায় প্রথম এবং লিবিয়ায় সপ্তম স্থান অর্জন করেছিলেন তিনি। টাঙ্গাইলের নাগরপুর থানার ভাদ্রা গ্রামের এই প্রতিভাধর ছাত্র ঢাকার মারকাযু ফয়জিল কোরআন আল ইসলামি মাদ্রাসার শিক্ষার্থী।
সেনেগালে শ্রেষ্ঠ আবু রায়হান
সেনেগালের রাজধানী ডাকারে ১১তম আন্তর্জাতিক হিফজুল কোরআন প্রতিযোগিতায় ২৮টি দেশের প্রতিযোগীদের হারিয়ে প্রথমস্থান দখল করেন হাফেজ আবু রায়হান। তিনি পুরস্কার হিসেবে পেয়েছেন ২০ হাজার মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২১ লাখ টাকা।
‘শিশু কারি’ হিসেবে খ্যাত আবু রায়হান এর আগেও আন্তর্জাতিক টেলিভিশন ভিত্তিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশকে গৌরবান্বিত করেছেন।
ইরানে বিজয়ী বশির আহমেদ
ইরানের শিক্ষার্থীদের জন্য আয়োজিত অষ্টম আন্তর্জাতিক কোরআন প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের হাফেজ বশির আহমেদ প্রথম স্থান অর্জন করেন। ইরানের শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও আওকাফ সংস্থা যৌথভাবে এ প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলার বেগুনাই গ্রামের এই প্রতিভাধর ছাত্র ঢাকার মারকাজুত তাহফিজ ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসার শিক্ষার্থী।
কুয়েতে প্রথম আনাস মাহফুজ
কুয়েতে ১৩তম আন্তর্জাতিক হিফজুল কোরআন প্রতিযোগিতায় ৮-১২ বছর বয়সীদের গ্রুপে প্রথম স্থান অর্জন করেন হাফেজ আনাস মাহফুজ। তার পুরস্কার ঘোষণা করা হয় ১৯ নভেম্বর। আনাস গোপালগঞ্জ জেলার অধিবাসী এবং ঢাকার মারকাযু ফয়জিল কোরআন আল ইসলামির ছাত্র।
মক্কায় ৩০ পারায় প্রথম আনাস বিন আতিক
মক্কার পবিত্র হারাম শরিফে অনুষ্ঠিত ৪৪তম আন্তর্জাতিক হিফজুল কোরআন প্রতিযোগিতায় ৩০ পারা গ্রুপে প্রথম স্থান অর্জন করেন হাফেজ আনাস বিন আতিক। তিনি পুরস্কার হিসেবে পেয়েছেন ২ লাখ সৌদি রিয়াল, যা প্রায় ৬৫ লাখ টাকা। আনাস ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার লোপাড়া গ্রামের বাসিন্দা এবং ঢাকার মারকাজুত তাহফিজ ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসার ছাত্র।
এই ছয়জন হাফেজের অর্জন শুধুমাত্র তাদের জন্য নয়, পুরো বাংলাদেশের জন্য গর্বের। কোরআনের জ্ঞানে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশিরা যে জায়গা করে নিচ্ছেন, তা একটি অনুপ্রেরণার গল্প হয়ে থাকবে আগামী প্রজন্মের জন্য।