ব্যক্তি ও বাপ-দাদার অন্ধ অনুসরণ হেদায়াতের প্রতিবন্ধক

মানুষের কল্যাণের জন্য আল্লাহ তাআলা যুগে যুগে অসংখ্য নবী-রাসুল প্রেরণ করেছেন। তাঁদের আহ্বান ছিল মানুষকে তাওহিদের পথে ডাক দেওয়া, আল্লাহর বিধান অনুযায়ী জীবন গড়ার প্রতি উদ্বুদ্ধ করা। কিন্তু প্রত্যেক যুগে কিছু দুর্ভাগা এমন ছিল, যারা নানা কারণে হিদায়াতের নিয়ামত ভোগ করতে পারেনি। শয়তানের ধোঁকা, নফসের দুর্বলতা এবং পারিপার্শ্বিক বিভিন্ন বাধা-প্রতিবন্ধকতা তাদের হিদায়াত থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে। নিম্নে হেদায়াত লাভের কয়েকটি  প্রতিবন্ধক সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো।

ব্যক্তি পূজা ও বাপ-দাদার অন্ধ অনুসরণ 

হেদায়েতের পথে প্রতিবন্ধকতার মৌলিক একটি  কারণ হলো দ্বিনি বিষয়ে পূর্বপুরুষদের অন্ধ অনুসরণ। এ কারণেই আবু তালেব সহ বহু কুরাইশ নেতা হেদায়াত থেকে দূরে থেকেছে। আবু তালেব সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে, ‘ইমাম জুহরি (রহ.) কর্তৃক সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যাব (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি স্বীয় পিতার সূত্রে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, যখন আবু তালিবের মৃত্যু নিকটবর্তী হলো, রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁর কাছে আসলেন। তিনি সেখানে আবু জাহল ও আব্দুল্লাহ ইবনু আবু উমাইয়াহ ইবনে মুগিরাকে পেলেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, হে চাচা! আপনি বলুন— লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। এ কালেমা দ্বারা আমি আপনার জন্য কেয়ামতে আল্লাহর কাছে প্রমাণ পেশ করতে পারব। আবু জাহল ও আব্দুল্লাহ ইবনু আবু উমাইয়াহ বলল, তুমি কি আব্দুল মুত্তালিবের ধর্ম ত্যাগ করবে? রাসুলুল্লাহ (সা.) বারবার তার কাছে এ কালিমা পেশ করতেই থাকলেন। আর তারা তাদের কথা পুনরাবৃত্তি করেই চলল। অবশেষে আবু তালিব তাঁদের সঙ্গে সর্বশেষ এ কথা বললেন, আমি আব্দুল মুত্তালিবের মিল্লাতের উপর আছি, এবং তিনি কালিমা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ পাঠ করতে অস্বীকৃতি জানালেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, আল্লাহর কসম! আমাকে নিষেধ না করা অবধি আপনার জন্য ক্ষমা চাইতেই থাকব। তারপর আল্লাহ অবতীর্ণ করলেন, ‘নবী ও মুমিনদের জন্য এটা শোভনীয় নয় যে, তারা মুশরিকদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করবে’। (সুরা তাওবা,আয়াত:১১৩)
আর আল্লাহ আবু তালিব সম্পর্কে আয়াত অবতীর্ণ করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে সম্বোধন করে তিনি বলেন, ‘তুমি যাকে ভালোবাস তাকেই সত্পথে আনতে পারবে না। তবে আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তাকে হেদায়াত দান করেন’ [সুরা কাছাছ, আয়াত:৫৬]। (বুখারি, হাদিস : ৪৭৭২)

বর্তমানেও অনেকে বাপ-দাদা ও পূর্বপুরুষের দোহাই দিয়ে হক গ্রহণ থেকে বিরত থাকছে। তাদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, আর যখন তাদের বলা হয়, আল্লাহ যা নাজিল করেছেন সেদিকে এবং রাসুলের দিকে তোমরা আসো। তখন তারা বলে আমাদের জন্য তাইই যথেষ্ট, যার উপরে আমরা আমাদের বাপ-দাদাদের পেয়েছি। যদিও তাদের বাপ-দাদারা কিছু জানত না এবং তারা সুপথপ্রাপ্ত ছিল না’। (সুরা মায়েদাহ, আয়াত : ১০৪)

কোরআন এবং হাদিসের ব্যাপারে অজ্ঞতা 

কোরআন এবং হাদিসের ব্যাপারে জ্ঞানের স্বল্পতা হেদায়াত লাভের অন্যতম প্রধান অন্তরায়। কারণ যারা ইসলামের মৌলিক শিক্ষা, আল্লাহর বিধান ও নবীজির সুন্নাহ সম্পর্কে জানে না, তারা সহজেই দ্বিনের পথ ভুল যায়। কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘বল যারা জানে আর যারা জনে না উভয়ে কি সমান’ ? (সুরা জুমার,আয়াত: ৯) 

হাদিস শরিফে এসেছে, আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রা.) থেকে  বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রাসুল (সা.)-কে বলতে শুনেছি, আল্লাহ তাঁর বান্দাদের অন্তর থেকে ইলম উঠিয়ে নেন না, বরং আলেমদের উঠিয়ে নেয়ার মাধ্যমে ইলমকে উঠিয়ে নিবেন। এমনকি যখন কোনো আলেম অবশিষ্ট থাকবে না তখন লোকেরা মূর্খদেরকেই নেতা বানিয়ে নিবে। তারা তাদেরকে (দ্বিনের বিষয়ে) জিজ্ঞেস করবে। অতঃপর তারা অজ্ঞতা সত্ত্বেও ফতোয়া প্রদান করবে। ফলে তারা নিজেরাও পথভ্রষ্ট হবে এবং অন্যকেও পথভ্রষ্ট করবে’। (বুখারি, হাদিস : ১০০)

তাই দ্বিনি বিষয়ের জ্ঞান অর্জন করা অত্যন্ত জরুরী। অন্যথায় হাদিসের ভাষায় পথভ্রষ্টতা অনিবার্য। 

দম্ভ-অহংকার হেদায়েত লাভের অন্তরায় 

এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন,‘এ পৃথিবীতে যারা অন্যায়ভাবে দম্ভ করে আমি তাদেরকে আমার আয়াতসমূহ থেকে ফিরিয়ে রাখব। তারা আমার সমস্ত নিদর্শন দেখলেও তাতে বিশ্বাস স্থাপন করবে না। তারা হেদায়াতের পথ দেখলেও সে পথে যাবে না। কিন্তু যদি ভ্রষ্টতার পথ দেখে তাহলে তারা সেটাই গ্রহণ করবে। এটা এ কারণে যে, তারা আমাদের আয়াত সমূহে মিথ্যারোপ করে এবং তারা এ থেকে উদাসীন’। (সুরা আরাফ, আয়াত : ১৪৬)

নবী (সা.) বলেন, ‘তোমাদের আগেকার উম্মতদের রোগ তোমাদের মধ্যেও সংক্রমিত হয়েছে। তা হল পরস্পর হিংসা-বিদ্বেষ ও ঘৃণা। আর এটা মুন্ডনকারী। আমি বলছি না যে, চুল মুন্ডন করে দেয়;বরং এটা দ্বিনকে মুন্ডন করে দেয়। সেই মহান সত্তার শপথ, যাঁর হাতে আমার জীবন! তোমরা ঈমানদার না হওয়া পর্যন্ত জান্নাতে প্রবেশ করবে না। আর তোমরা পরস্পরকে ভাল না বাসলে ঈমানদার হতে পারবে না। আমি কি তোমাদেরকে বলবো না যে, পারস্পরিক ভালবাসা কোন কাজের মাধ্যমে মজবুত হয়? তোমরা পরস্পর সালামের বিস্তার ঘটাও’। (তিরমিজি, হাদিস : ২৫১০)

নেতৃত্ব ও পদমর্যাদার লোভ 

নেতৃত্ব বা পদ মর্যাদার লোভ হেদায়াত লাভের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। এক্ষেত্রে হিরাকলের অবস্থা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। রাসুল (সা.)-এর দূত দাহিয়াতুল কালবি (রা.) হিরাকলের নিকটে গেলে তিনি পত্র পাঠ ও আবু সুফিয়ান (রা.)-এর কাছে রাসিলের অবস্থা জানার পর বলেন, ‘তুমি যা বলেছ তা যদি সত্য হয়, তবে শীঘ্রই তিনি আমার এ দুপায়ের নীচের জায়গার অধিকারী হবেন। আমি নিশ্চিত জানতাম, তাঁর আবির্ভাব হবে। কিন্তু তিনি যে তোমাদের মধ্য থেকে  হবেন, এ কথা ভাবতে পারিনি। যদি জানতাম, আমি তাঁর নিকট পৌঁছতে পারব, তাহলে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাত্ করার জন্য আমি যে কোন কষ্ট সহ্য করতাম। আর আমি যদি তাঁর নিকট থাকতাম তবে অবশ্যই তাঁর পা দুখানা ধৌত করে দিতাম। …অতঃপর তিনি সম্মুখে এসে বললেন, হে রোমের অধিবাসী! তোমরা কি মঙ্গল, হেদায়াত এবং তোমাদের রাষ্ট্রের স্থায়িত্ব চাও? তাহলে এই নবীর নিকটে বাইআত গ্রহণ কর। এ কথা শুনে তারা বন্য গাধার ন্যায় দ্রুত নিঃশ্বাস ফেলতে ফেলতে দরজার দিকে ছুটল। কিন্তু তারা তা বন্ধ দেখতে পেল। হিরাক্লিয়াস যখন তাদের অনীহা লক্ষ্য করলেন এবং তাদের ঈমান থেকে নিরাশ হয়ে গেলেন। তখন বললেন, ওদের আমার নিকট ফিরিয়ে আন। তিনি বললেন, আমি অব্যবহিত পূর্বে যে কথা বলেছি, তা দ্বারা তোমাদের দ্বিনের উপরে তোমাদের দৃঢ়তার পরীক্ষা করছিলাম। এখন তা দেখে নিলাম। একথা শুনে তারা তাঁকে সিজদা করল এবং তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হল। এটাই ছিল হিরাক্লিয়াসের সর্বশেষ অবস্থা’। (বুখারি, হাদিস : ০৭)

প্রবৃত্তির অনুসরণ ও সম্পদের লোভ 

যুগে যুগে প্রবৃত্তির অনুসরণ ও সম্পদের লোভ বহু মানুষকে হেদায়েতের পথ থেকে বিরত রেখেছে। তত্কালীন বিখ্যাত কবি আশা বিন কায়েস ইবনে সালাবার ক্ষেত্রে যেমনটি ঘটেছিল। সে ইসলাম গ্রহণের উদ্দেশ্যে রাসুল (সা.)-এর সাথে সাক্ষাতের জন্য ইয়ামন থেকে রওয়ানা হয়। সে মক্কা অথবা মক্কার নিকটবর্তী পৌঁছার পর আবু জাহল এসে বলল, হে আবু বাসির, ওই মুহাম্মাদ তো ব্যভিচার নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। আশা বললেন, আল্লাহর কসম, আমার তো ব্যভিচারের আদৌ কোন প্রয়োজন নেই। সে বলল, হে আবু বাসির, তিনি তো মদ্যপান নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। আশা বললেন, আল্লাহর কসম, মদের প্রতি তো আমার চরম দুর্বলতা রয়েছে। ঠিক আছে আমি তাহলে এবারকার মত ফিরে যাব এবং এই এক বছর তৃপ্তি সহকারে মদ পান করে নেব। তারপর মুহাম্মাদের নিকট ফিরে এসে ইসলাম গ্রহণ করব। এ যাত্রা তিনি ফিরে যান। ওই বছরেই তার মৃত্যু হয়। পুনরায় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নিকট ফিরে আসার সুযোগ তার হয়ে উঠেনি। (আলবিদায়া ওয়ান নিহায়া : ৩/১০২)

মূলত প্রবৃত্তি পুজা এভাবে মানুষকে হেদায়াত থেকে ফিরিয়ে রাখে। আর এরূপ মানুষের পরিণতি হবে ভয়াবহ। আল্লাহ বলেন, তুমি কি দেখেছ তাকে যে তার খেয়াল-খুশীকে তার উপাস্য বানিয়েছে? আর আল্লাহ তাকে জেনে-শুনেই পথভ্রষ্ট করেছেন। তার কানে ও অন্তরে মোহর মেরে দিয়েছেন এবং তার চোখের উপর আবরণ টেনে দিয়েছেন। অতএব আল্লাহর পরে কে তাকে সুপথ প্রদর্শন করবে? এরপরেও কি তোমরা উপদেশ গ্রহণ করবে না’? (সুরা জাছিয়া, আয়াত : ২৩)

হেদায়াতের উপযুক্ত না হওয়া 

হেদায়েত অত্যন্ত মূল্যবান। বিশেষভাবে কাফের মুনাফেক এবং জালিমরা এ নেয়ামত ভোগ করতে পারে না। আল্লাহ তাআলা বলেন, বস্তুত, আল্লাহ অবিশ্বাসী সম্প্রদায়কে সুপথ প্রদর্শন করেন না’। (সুরা বাকারা, আয়াত : ২৬৪)

এ প্রসঙ্গে হাদিস শরিফে এসেছে, জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) থেকে  বর্ণিত, এক বেদুঈন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নিকট ইসলামের বাইআত করল। তারপর সে জ্বরে আক্রান্ত হলো। তখন সে বলল, আমার বাইআত ফিরিয়ে দিন। রাসুলুল্লাহ (সা.) তা অস্বীকৃতি জানালেন। সে আবার তাঁর কাছে আসল। তিনি আবার অস্বীকৃতি জানালেন। সে আবার তাঁর কাছে এসে বলল, আমার বাইআত ফিরিয়ে দিন। তিনি আবারও অস্বীকার করলেন। তখন সে বেরিয়ে গেল। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, মদিনা হাপরের মতো, সে তার আবর্জনাকে দূর করে দেয় এবং ভালোটাকে ধরে রাখে’। (বুখারি, হাদিস : ৭২০৯)

আল্লাহ আমাদের হেদায়েতের উপর অটল থাকার তাওফিক দান করুন।

মুফতি ইবরাহিম সুলতান

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *