মাতৃভাষা চর্চায় ইসলামের নির্দেশনা

ভাষা মহান আল্লাহতায়ালার এক অনুপম নিদর্শন। পৃথিবীজুড়ে ছড়িয়ে আছে হাজার হাজার ভাষা। আবহমানকাল থেকে মানুষ ভাষার মাধ্যমে মনের ভাব আদানপ্রদান করে। সুখদুঃখ, হাসিকান্না পরস্পর ভাগাভাগি করে নেওয়ার অপরিহার্য অনুষঙ্গ এ ভাষা। যাপিত জীবনের পরতে পরতে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে ভাষা। মানবজীবনে ভাষার গুরুত্ব অপরিসীম। বিশ্ব মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে সাড়ে চৌদ্দ শ বছর আগে মানব ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম ব্যক্তিত্ব রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে মহাগ্রন্থ আল কোরআন প্রাপ্ত হয়েছিলেন তাতে ভাষার বৈচিত্র্যকে আল্লাহর অনন্য নিদর্শন বলে সাব্যস্ত করা হয়েছে।

ইরশাদ হয়েছে- তাঁর (আল্লাহর) এক নিদর্শন হচ্ছে নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের সৃজন এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য। নিশ্চয়ই এতে জ্ঞানীদের জন্য নিদর্শনাবলি রয়েছে। (সুরা রুম- ২২)।

রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন ‘আফসাহুল আরব’ বা আরবের শ্রেষ্ঠ বিশুদ্ধভাষী। আরবি শুধু দীনি ভাষাই নয়; বরং সংশ্লিষ্ট ভৌগোলিক জনপদের বাসিন্দাদের মাতৃভাষাও বটে। রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিশুদ্ধ ভাষার ব্যাপারে খুবই সচেতন ছিলেন। তিনি বিভিন্ন সময় সাহাবায়ে কেরামকে ভাষার শাব্দিক ব্যবহারে সচেতন করতেন।

একবার এক সাহাবি রসুল (সা.)-এর কাছে এলেন। তিনি বাইরে থেকে সালাম দিয়ে বলেন, ‘আ-আলিজু?’ (আমি কি প্রবেশ করব?) ঢোকা অর্থে এ শব্দের ব্যবহার আরবি ভাষায় আছে; কিন্তু অনুমতি প্রার্থনার ক্ষেত্রে তা প্রমিত শব্দ নয়। প্রমিত শব্দ হচ্ছে- ‘আ-আদখুলু?’ তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তুমি ‘আ-আদখুলু?’ বল। (আবু দাউদ, হাদিস : ৫১৭৯)।

রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এভাবে তাঁর শব্দ প্রয়োগ ঠিক করে দিয়েছেন। অথচ তা জিকির-আসকার বা এ জাতীয় কোনো বিষয় ছিল না। সহিহ মুসলিমে একটি স্বতন্ত্র অধ্যায়ই আছে ‘কিতাবুল আলফাজ’ শিরোনামে। সেখানে বিভিন্ন হাদিসে আমরা দেখতে পাই, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শব্দ প্রয়োগ সংশোধন করেছেন, এশার নামাজকে ‘আতামা’ বল না, ‘এশা’ বল। আঙুরকে ‘করম’ বল না, ‘ইনাব’ বল ইত্যাদি।

সাহাবা-তাবেয়িন, সালাফে সালেহীন ও আমাদের আকাবির বিশুদ্ধ ভাষায় কথা বলতেন। তালিম ও তাদরিসের ক্ষেত্রে সর্বদা অশুদ্ধ ভাষা বর্জন করতেন।

নাফে (রাহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘ইবনে ওমর (রা.) তাঁর সন্তানকে অশুদ্ধ ভাষায় কথা বলার কারণে প্রহার করতেন।’ ইমাম বুখারি আল আদাবুল মুফরাদে ‘অশুদ্ধ ভাষা ব্যবহারে প্রহার’ অনুচ্ছেদে হাদিসটি বর্ণনা করেছেন। ইবনে তাইমিয়্যাহ (রাহ.) বলেন, ‘পূর্বসূরিরা ভাষায় ভুল করলে তাদের সন্তানদের শাসন করতেন।’ (-মাজমূউল ফাতাওয়া ৩২/২৫২)।

সাহাবায়ে কেরামসহ আমাদের আসলাফের কাছে সম্মান-অসম্মান, মানমর্যাদা ও আভিজাত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড ছিল ভাষার ব্যবহার। প্রাচীন আরবদের মধ্যেও বিশুদ্ধভাষীরাই ছিল বিশেষ আভিজাত্যের অধিকারী।

ইমাম জুহরী (রাহ.) বলেন, ‘আমার মতে বিশুদ্ধ ভাষার চেয়ে বড় আভিজাত্যের বস্তু আর কিছু নেই।’ (-হিলইয়া ৩/৩৬৪; আলমুরুআ, আবু বকর মারযুবান, ৪৩)।

তিনি আরও বলেন, ‘বিশুদ্ধ ভাষা আভিজাত্যের অন্তর্ভুক্ত।’ (বাহজাতুল মাজালিস ২/১/৬৪৩)।

আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক (রহ.) বলেন, ‘ভাষার সংশোধন ও তার সঠিক ব্যবহার সবচেয়ে বড় আভিজাত্য। (-আলমুরুআ, আবু বকর মারযুবান, ৭০)।

বিশুদ্ধ ভাষাচর্চা শুধু সাহিত্যের ভিত্তি কিংবা অনুষঙ্গই নয়, বরং এটা শরিয়তের কাম্য বিষয়াবলির অন্যতম। রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র জীবনাদর্শের বিমল শিক্ষা হচ্ছে- দৈনন্দিন জীবনে একজন মুমিনের ভাষা বিশুদ্ধ ও শালীন হতে হবে। এটা দীনি ভাষার প্রসঙ্গ নয়, মাতৃভাষার প্রসঙ্গ। অতএব, মাতৃভাষা যা-ই হোক, তার বিশুদ্ধতা শরিয়তের কাম্য। আর এটা কখনো চর্চা ছাড়া হাসিল হবে না। যুগে যুগে মহান আল্লাহ তাঁর নবী-রসুলদের স্বজাতির ভাষায় পারদর্শিতা দিয়ে প্রেরণ করেছেন, যাতে তারা তাদের উম্মতদের সহজে আল্লাহর বাণী পৌঁছে দিতে পারেন। উম্মতরা তাঁদের কথা বুঝতে পারে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে- ‘আমি রসুলদের তাদের স্বজাতির ভাষাভাষী করে প্রেরণ করেছি, যাতে তাদের (দীন) স্পষ্টভাবে বুঝতে পারেন।’ (সুরা : ইবরাহিম, আয়াত-৪)। একুশে ফেব্রুয়ারি। ১৯৫২ সালের এ দিনে বাংলা মায়ের দামাল ছেলেরা মাতৃভাষা বাংলার জন্য রাজপথে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। কিন্তু আজ সর্বত্রই বাংলা ভাষা অবহেলার শিকার। কথায় কথায় ইংরেজি শব্দের ব্যবহার বাংলা ভাষার অবজ্ঞা বৈ কিছু নয়। তাই আসুন নবীর নির্দেশনা মেনে বিশুদ্ধ বাংলা ভাষা চর্চায় আত্মনিয়োগ করি।

লেখক : আবদুল্লাহ আল মামুন আশরাফী খতিব, আউচপাড়া জামে মসজিদ টঙ্গী, গাজীপুর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *