
হযরত ওমর (রা.) ৫৮৩ খ্রিস্টাব্দে কুরাইশ বংশের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি শক্তিশালী বীরপুরুষ এবং আরবের অন্যতম বিখ্যাত কুস্তিগীর হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন। ওমর (রা.) শিক্ষিত ছিলেন। তাঁর পেশা ছিল ব্যবসা।
ব্যবসায় তিনি যথেষ্ট উন্নতি লাভ করেন। তিনি এমনই ঘোরতর ইসলামবিদ্বেষী ছিলেন যে একদিন হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে হত্যা করার জন্য রওনা হন। পথিমধ্যে তাঁর ভগ্নীর ও ভগ্নীপতির ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার কথা জানতে পেরে তাঁদের বাসায় ছুটে যান এবং তাঁদের প্রহার করতে শুরু করেন। কিন্তু তাঁরা ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করতে রাজি না হওয়ায় অবশেষে তিনি তাঁদের নিকট কোরআন শরিফের বাণী শুনতে চাইলেন।
ভগ্নীর কণ্ঠে সুরা ত্বা-হা পাঠ শুনে তিনি মুগ্ধ হয়ে গেলেন। এরপর হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর কাছে গমন করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। ওমর (রা.)-এর ইসলাম গ্রহণের পর মক্কায় ইসলাম প্রকাশ্য রূপ নেয়। তাই হযরত মুহাম্মদ (সা.) হযরত ওমর (রা.)-কে ‘ফারুক’ উপাধিতে ভূষিত করনে।
‘ফারুক’ শব্দের অর্থ হচ্ছে সত্য ও মিথ্যার মধ্যে প্রভেদকারী।
তাবুক অভিযানের সময় ওমর (রা.) তাঁর সব সম্পত্তির অর্ধেক যুদ্ধ তহবিলে প্রদান করেন। তিনি তাঁর বিধবা কন্যা হাফসা (রা.)-কে নবী করিম (সা.)-এর কাছে বিবাহ দেন। তিনি হযরত আবু বকর (রা.)-এর খিলাফতের সময় প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব ও প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব কৃতিত্বের সঙ্গে পালন করেন। মোটামুটি এ ছিল হযরত ওমর (রা.)-কে দ্বিতীয় খলিফা হিসেবে নির্বাচিত করার সংক্ষিপ্ত প্রেক্ষাপট।
এখন কিভাবে হযরত ওমর (রা.)-কে মদিনাভিত্তিক রাষ্ট্রের খলিফা নির্বাচিত করা হয় সে ব্যাপারে আলোচনা করা হবে। প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর (রা.) ৬৩৪ খ্রিস্টাব্দের আগস্ট মাসের প্রথম দিকে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনি তাঁর মৃত্যুর পূর্বে সবচেয়ে উপযুক্ত একজনকে পরবর্তী খলিফা নির্বাচনের জন্য অত্যন্ত ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। দীর্ঘ দিনের অভিজ্ঞতায় হযরত আবু বকর (রা.)-এর মনে এ দৃঢ় বিশ্বাস সৃষ্টি হয় যে হযরত ওমর (রা.)-ই হচ্ছেন খিলাফতের গুরুদায়িত্ব বহনের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি।
দুই বছর দুই মাস আগে হযরত আবু বকর (রা.)-এর প্রথম খলিফা হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার সময় মোহাজিরদের মধ্যে থেকে হযরত আবু বকর (রা.)-এর বাদে আরো যে দুজনের নাম খলিফা পদের জন্য প্রস্তাব উঠেছিল তার মধ্যে হযরত ওমর (রা.)-এরও নাম ছিল। এ পরিপ্রেক্ষিতে হযরত আবু বকর (রা.) তাঁর মৃত্যুর পর নতুন করে বিশিষ্টজনদের ও আগ্রহীদের সভার মধ্য দিয়ে দ্বিতীয় খলিফা নির্বাচনের উদ্দেশ্যে খলিফা পদের জন্য নতুন করে নাম প্রস্তাবের প্রয়োজনীয়তা বোধ করেননি।
এমতাবস্থায় হযরত আবু বকর (রা.) ওমর (রা.)-কে খলিফা পদে নির্বাচনের সপক্ষে জনমত যাচাই এর জন্য বিশিষ্ট সাহাবিদের সঙ্গে পরামর্শ করে নিতে চাইলেন। সর্বপ্রথম তিনি হযরত আবদুর রহমান বিন আউফ (রা.)-এর সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করলেন। আবদুর রহমান বিন আউফ (রা.) বলেন, ‘ওমর (রা.)-এর যোগ্যতা সম্পর্কে কোনো সন্দেহ নেই, তবে তাঁর স্বভাব বড় কঠোর প্রকৃতির।’ এর জবাবে খলিফা আবু বকর (রা.) বলেন, ‘তাঁর স্বভাবের কঠোরতা এ জন্য যেহেতু আমি অত্যন্ত নরম; তবে কর্তব্যের চাপ পড়লে তিনিও আপনা থেকেই নরম হয়ে যাবেন।’
এমতাবস্থায় হযরত আবু বকর (রা.) ওমর (রা.)-কে খলিফা পদে নির্বাচনের সপক্ষে জনমত যাচাই এর জন্য বিশিষ্ট সাহাবিদের সঙ্গে পরামর্শ করে নিতে চাইলেন। সর্বপ্রথম তিনি হযরত আবদুর রহমান বিন আউফ (রা.)-এর সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করলেন। আবদুর রহমান বিন আউফ (রা.) বলেন, ‘ওমর (রা.)-এর যোগ্যতা সম্পর্কে কোনো সন্দেহ নেই, তবে তাঁর স্বভাব বড় কঠোর প্রকৃতির।’ এর জবাবে খলিফা আবু বকর (রা.) বলেন, ‘তাঁর স্বভাবের কঠোরতা এ জন্য যেহেতু আমি অত্যন্ত নরম; তবে কর্তব্যের চাপ পড়লে তিনিও আপনা থেকেই নরম হয়ে যাবেন।’
এরপর
এমতাবস্থায় হযরত আবু বকর (রা.) ওমর (রা.)-কে খলিফা পদে নির্বাচনের সপক্ষে জনমত যাচাই এর জন্য বিশিষ্ট সাহাবিদের সঙ্গে পরামর্শ করে নিতে চাইলেন। সর্বপ্রথম তিনি হযরত আবদুর রহমান বিন আউফ (রা.)-এর সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করলেন। আবদুর রহমান বিন আউফ (রা.) বলেন, ‘ওমর (রা.)-এর যোগ্যতা সম্পর্কে কোনো সন্দেহ নেই, তবে তাঁর স্বভাব বড় কঠোর প্রকৃতির।’ এর জবাবে খলিফা আবু বকর (রা.) বলেন, ‘তাঁর স্বভাবের কঠোরতা এ জন্য যেহেতু আমি অত্যন্ত নরম; তবে কর্তব্যের চাপ পড়লে তিনিও আপনা থেকেই নরম হয়ে যাবেন।’
আবদুর রহমান বিন আউফ (রা.) আর আপত্তি করেননি। অতঃপর তিনি ওসমান (রা.)-এর সঙ্গে এ ব্যাপারে আলাপ-আলোচনা করলেন। ওসমান (রা.) ওমর (রা.)-এর পক্ষে মতামত প্রকাশ করলেন। তারপর আবু বকর (রা.) অন্যান্য বিশিষ্ট আনসার ও মোহাজিরদের সঙ্গেও আলাপ-আলোচনা করেন। তালহা (রা.) ছাড়া বিশিষ্ট আনসার ও মোহাজিররা ওমর (রা.)-কে দ্বিতীয় খলিফা করার ব্যাপারে সমর্থন করলেন।
মদিনাভিত্তিক রাষ্ট্রের খলিফার পদে ওমর (রা.)-কে নির্বাচিত করার ব্যাপারে আবু বকর (রা.) ওমর (রা.)-কে বললে তিনি প্রথমে খলিফা হতে রাজি হননি। তিনি বলেন, ‘আমি খিলাফত চাই না।’ এর প্রত্যুত্তরে আবু বকর (রা.) বলেন, ‘ওমর, তুমি খিলাফত না চাইতে পারো; কিন্তু খিলাফত তোমাকে চায়।’
ওমর (রা.)-কে রাজি করানোর পর আবু বকর (রা.) ওসমান (রা.) ডেকে এনে ওমর (রা.)-এর পক্ষে একটি পত্র লিখে নিলেন। এ সময় অসংখ্য লোক তাঁর বাসগৃহের সম্মুখে সমবেত হয়েছিল। আবু বকর (রা.) উপস্থিত জনতাকে সম্বোধন করে বললেন, ‘ভাই সব! আমি আমার কোনো আত্মীয়-স্বজনকে খলিফা পদে মনোনয়ন করিনি; বরং হজরত ওমর (রা.)-কে মনোনীত করেছি, যেন আপনারা এ সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট হন।’
এ কথা শুনে উপস্থিত জনতা সমবেত কণ্ঠে বলে উঠল, ‘আমরা আপনার কথা শুনলাম এবং নির্বিবাদে মেনে নিলাম।’ এভাবে ওমর (রা.) ৬৩৪ খ্রিস্টাব্দের আগস্ট মাসে মদিনাভিত্তিক রাষ্ট্রের দ্বিতীয় খলিফা নির্বাচিত হন।
খলিফা পদে অধিষ্ঠিত হয়ে ওমর (রা.) ভাষণে বলেন, ‘হে লোক সকল! আমার ওপর আপনাদের কতগুলো অধিকার রয়েছে, আমার নিকট থেকে তা আদায় করা আপনাদের কর্তব্য। প্রথমত, দেশের রাজস্ব ও গনিমতের মাল যেন অযথা ব্যয় হতে না পারে, দ্বিতীয়ত, আপনাদের জীবিকার মান উন্নয়ন ও সীমান্ত সংরক্ষণ আমার কর্তব্য। আমার প্রতি আপনাদের এই অধিকার আছে যে আমি আপনাদিগকে কখনো বিপদে ফেলব না।’
অপর এক ভাষণে তিনি বলেন, ‘আপনাদের যে কেউ আমার মধ্যে নীতি-বিচ্যুতি দেখতে পেলে, সে যেন আমাকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে চেষ্টা করে।’ উপস্থিত শ্রোতাদের মধ্যে থেকে এক নওজোয়ান দাঁড়িয়ে তরবারি উত্তোলন করে বললেন, ‘আল্লাহর শপথ, আমরা আপনার মধ্যে কোনো নীতি-বিচ্যুতি দেখতে পেলে এই তীক্ষধার তরবারি দ্বারা তাহা ঠিক করে দেব।’ এ জবাবে ওমর (রা.) সন্তুষ্ট হয়ে বলেন, ‘আল্লাহ এ জাতির মধ্যে এমন লোক তৈরি করেছেন যারা তার নীতি-বিচ্যুতি সংশোধন করতে পারেন। এ জন্য আমি আল্লাহর শোকর আদায় করতেছি।’
এ পর্যন্ত আলোচনা হতে দেখা যায়, ওমর (রা.) উত্তরাধিকারসূত্রে খলিফা হননি এবং তিনি খলিফা হওয়ার জন্য কোনো চেষ্টাও করেননি। সবার চেয়ে বেশি উপযুক্ত হওয়ায় ও ন্যায়-পরায়ণতার জন্যই জনগণের পছন্দে ওমর (রা.) খলিফা নির্বাচিত হন। খলিফা পদে অধিষ্ঠিত হয়ে তিনি যে ভাষণ দেন তা হচ্ছে জনকল্যাণমূলক। তাঁর খলিফা নির্বাচিত হওয়ার পদ্ধতি ও জনকল্যাণমূলক ভাষণ হচ্ছে ইসলামী গণতন্ত্রের প্রতিচ্ছবি।