
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান বলেছেন, ইসরায়েল গাজায় মানবিক সহায়তা প্রবেশে ধারাবাহিকভাবে বাধা দিচ্ছে এবং এক্ষেত্রে তারা মনগড়া অজুহাত দাঁড় করাচ্ছে। বুধবার (২৫ ডিসেম্বর) আঙ্কারায় ক্ষমতাসীন জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (একে) পার্টির বর্ধিত প্রাদেশিক প্রধানদের বৈঠকে এসব কথা বলেন তিনি। খবর আনাদোলু এজেন্সির।
এরদোয়ান বলেন, ইসরায়েল কোনো প্রতিশ্রুতি রক্ষা করছে না এবং ইচ্ছাকৃতভাবে মানবিক সহায়তা প্রবেশে জটিলতা সৃষ্টি করছে। তিনি অভিযোগ করেন, ‘ইসরায়েল কথা রাখছে না এবং মনগড়া অজুহাতে ত্রাণ প্রবেশে বাধা দিচ্ছে,’।
গাজায় গত ১১ অক্টোবর থেকে যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও বাস্তব পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি বলে মন্তব্য করে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট বলেন, ইসরায়েল যেসব আবাসিক এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে, সেখানে এখনও চরম দুর্ভোগ চলছে।
ফিলিস্তিনিদের প্রতি তুরস্কের সহায়তা আরও বাড়ানো হবে জানিয়ে এরদোয়ান বলেন, ‘বরকতময় তিন মাসে আমরা ফিলিস্তিনের জন্য আমাদের সহায়তা বৃদ্ধি করব। তুরস্ক পিছু হটবে না, নীরব থাকবে না, ভুলে যাবে না এবং গাজাকে কখনো একা ছেড়ে দেবে না।’
শীতকাল শুরু হওয়ায় গাজার মানবিক সংকট আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে বলে উল্লেখ করে এরদোয়ান বলেন, ভারী বৃষ্টিতে ত্রাণশিবিরের তাঁবু ডুবে যাওয়ার দৃশ্য এবং প্রচণ্ড ঠান্ডায় শিশু ও নবজাতকদের হাইপোথার্মিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার ছবি গোটা তুরস্ককে ব্যথিত করছে।
চুক্তি অনুযায়ী প্রতিদিন গাজায় ৬০০টি ত্রাণবাহী ট্রাক প্রবেশের কথা থাকলেও ইসরায়েল সেই প্রতিশ্রুতিও মানছে না বলে অভিযোগ করেন তিনি। তবে এসব প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও তুরস্ক গাজার নিপীড়িত জনগণের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে বলে জানান এরদোয়ান।
তিনি বলেন, তুরস্কের ১৯তম ত্রাণবাহী জাহাজ গত সপ্তাহে মিসরের আল-আরিশ বন্দরে পৌঁছেছে, যাতে এক হাজার ৩০০ টন মানবিক সহায়তা ছিল। গত দু’বছরে গাজায় তুরস্কের পাঠানো মোট ত্রাণের পরিমাণ প্রায় এক লাখ ৫ হাজার টনে পৌঁছেছে বলেও জানান তিনি।
গাজার জরুরি চাহিদার কথা তুলে ধরে এরদোয়ান বলেন, সেখানে ওষুধ, খাদ্য, পোশাক এবং শীত নিবারণের জ্বালানি অত্যন্ত প্রয়োজন। ‘সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন আশা, সংহতি ও নৈতিক সমর্থনের। সে কারণেই আমরা বেশি বেশি দোয়া করব,’ বলেন তিনি।
গাজা বিষয়ে তুরস্কের অবস্থানকে বৃহত্তর মানবিক নীতির অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করে এরদোয়ান বলেন, তুরস্ক সবসময় বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। ককেশাস থেকে বলকান, আফ্রিকা থেকে এশিয়া—যেখানেই মানুষ সংকটে পড়েছে, তুরস্ক সেখানে সহায়তায় এগিয়ে গেছে বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তুরস্ক শান্তির পক্ষে থাকলেও কোনো অন্যায় বা নিপীড়নের সঙ্গে আপস করবে না। ‘আমরা শান্তি ও স্থিতিশীলতার পক্ষে, কিন্তু এর মানে এই নয় যে আমরা অন্যায় মেনে নেব বা নিপীড়নের মুখে নীরব থাকব,’ বলেন এরদোয়ান।
তিনি আরও বলেন, তুরস্ক তার ইতিহাসজুড়ে নিপীড়িত মানুষের আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছে—ধর্ম, ভাষা কিংবা জাতিগত পরিচয় বিবেচনা না করেই।
ভূমধ্যসাগর, এজিয়ান অঞ্চল বা অন্য কোথাও তুরস্ক কারও অধিকার লঙ্ঘন করে না এবং নিজের অধিকার লঙ্ঘন হতেও দেবে না বলে হুঁশিয়ারি দেন এরদোয়ান। একই সঙ্গে তিনি বলেন, তুর্কি সাইপ্রিয়টদের অধিকার ক্ষুণ্ন হতে দেওয়া হবে না।
দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা প্রসঙ্গে এরদোয়ান বলেন, ‘সন্ত্রাসমুক্ত তুরস্ক’ গড়ার প্রচেষ্টা শুধু দেশের ভেতরেই নয়, প্রতিবেশী অঞ্চলেও আশার সঞ্চার করেছে। তিনি বলেন, আরব, কুর্দি, তুর্কমেন, সুন্নি ও শিয়া জনগোষ্ঠী ভবিষ্যতের দিকে নতুন আশায় তাকিয়ে আছে।
শেষে এরদোয়ান বলেন, আন্তর্জাতিক আইন, দ্বিপাক্ষিক চুক্তি ও তুরস্কের সুদীর্ঘ রাষ্ট্রীয় ঐতিহ্যের আলোকে দেশটি মর্যাদা, প্রজ্ঞা, সংযম ও শান্ত মনোভাব নিয়ে কাজ করে যাবে।