
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান হয়েছে। দেশ ফের গণতান্ত্রিক ধারায় ফেরার পথে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, আগামী ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচন কমিশনও দীর্ঘদিন পর মানুষের ভোটাধিকার ফেরাতে প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। কিন্তু জাতীয় সংসদ নির্বাচন পেছাতে বিগত কয়েক মাস ধরেই নানা দাবি-দাওয়ার আড়ালে একের পর এক ষড়যন্ত্র অব্যাহত রয়েছে। এই ষড়যন্ত্রে ঘি ঢেলেছে গত ২৮ জুলাই জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের জমা দেয়া জুলাই সনদ বাস্তবায়নের উপায়-সম্পর্কিত সুপারিশ। যেখানে জুলাই সনদ নিয়ে প্রস্তাবিত গণভোট ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচনের দিনই হবে, নাকি তার আগেই অনুষ্ঠিত হবে সেই সিদ্ধান্ত সরকারের ওপরই ছেড়ে দেয়া হয়েছে। এর ফলে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে যে পক্ষটি যথসময়ে নির্বাচন বানচালে পিআর (সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব) পদ্ধতিতে নির্বাচনের দাবি তুলে মাঠ গরমের চেষ্টা করেছিল, সেই দাবিতে হালে পানি না পেয়ে আবার তারা জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে গণভোটের দাবি নিয়ে মাঠে নেমেছে।
জামায়াতে ইসলামীর নেতারা নভেম্বরের মধ্যেই গণভোটের দাবিতে হুঙ্কার দিচ্ছেন। দলটির এমন হুঙ্কারকে গণতন্ত্র ধ্বংসের ষড়যন্ত্র হিসেবেই দেখছে বিএনপি। দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, গণঅভ্যুত্থানের পর আজকে বাংলাদেশে বিভিন্ন রকমভাবে একটা প্রচেষ্টা চলছে, একটা চক্রান্ত চলছে গণতন্ত্রকে আবারো ধ্বংস করার জন্যে। আর অন্তর্বর্তী সরকার নিজেরাই একটি অবস্থা তৈরি করছে, যাতে নির্বাচন ব্যাহত হয়। আর গণভোট ইস্যুতে বিএনপি আগে যে অবস্থানে ছিলÑ জাতীয় নির্বাচনের দিনই গণভোট হবে, সেই অবস্থানেই অনড় রয়েছে বলে জানিয়ে দিয়েছেন তিনি।
বিএনপি মহাসচিব বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর একটি জোট গণভোটের জন্য চাপ দিচ্ছে। তারাও নির্বাচনকে বানচাল করার জন্য ষড়যন্ত্র করছে। আমরা খুব পরিষ্কার করে বলে দিতে চাই, গণভোট হলে নির্বাচনের দিনই হতে হবে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে গণভোটের কোনো সুযোগ নেই মন্তব্য করে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ঐকমত্য কমিশন যে প্রস্তাব দিয়েছে, সেই প্রস্তাব কমিশনের হতে পারে, তবে বিএনপি একমত নয়। আমরা পরিষ্কারভাবে বলেছি, আমাদের অবস্থান হলো গণভোট এবং নির্বাচন একই দিনে, দুটি আলাদা ব্যালটের মাধ্যমে হবে। এটা দিনের আলোর মতো স্পষ্ট। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে গণভোটের কোনো সুযোগ নেই।
তিনি বলেন, নতুন করে এ বিষয়টি সামনে আনার কোনো সুযোগ নেই এবং এ নিয়ে আলাপ-আলোচনারও কোনো সুযোগ নেই। নির্বাচনের দিন দুটি আলাদা ব্যালটের মাধ্যমে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। এর বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এটি বিএনপির প্রথম দিন থেকেই অবস্থান, যা এখনো অপরিবর্তিত এবং ভবিষ্যতেও পরিবর্তন হবে না।
গত ২৮ অক্টোবর জুলাই সনদ বাস্তবায়নের উপায় সম্পর্কিত সুপারিশ সরকারের কাছে জমা দিয়েছে ঐকমত্য কমিশন। সেখানে জুলাই সনদ নিয়ে প্রস্তাবিত গণভোট ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচনের দিনই হবে নাকি তার আগেই অনুষ্ঠিত হবে, সেই সিদ্ধান্ত সরকারের ওপরই ছেড়ে দেয়া হয়েছে। সেখানে দুটি বিকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে, প্রস্তাব দুটির মূলভাব একই। সরকার জুলাই সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ জারি করবে; সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সংসদ গঠিত হবে এবং সংসদ সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবে কাজ করবে, যার সাংবিধানিক বিষয়ে ‘মূল ক্ষমতা’ প্রয়োগের অধিকার থাকবে। প্রথম প্রস্তাব হচ্ছে, গণভোটে যে প্রশ্ন থাকবে তার সঙ্গে আদেশের একটি সূচিতে সংস্কারগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হবে। আর দ্বিতীয় প্রস্তাবে বলা হয়েছেÑ সনদের প্রস্তাবের ভিত্তিতে একটি সংবিধান সংস্কার খসড়া বিল প্রণয়ন করে তা আদেশের সূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। সংবিধান সংস্কার পরিষদ প্রথম বৈঠকের ২৭০ দিনের মধ্যে কাজ শেষ করতে ব্যর্থ হলে, ওই সংস্কারগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হবে এবং সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হবে।
জুলাই সনদে রাজনৈতিক দলগুলো স্বাক্ষরের সময়ে যেসব বিষয় ছিল ঐকমত্য কমিশনের এই সুপারিশে বেশ কিছু সংযোজন-বিয়োজন করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। বিএনপি এই সুপারিশকে প্রতারণা বলে আখ্যায়িত করেছে। আর সুপারিশের ভিত্তিতে জামায়াত জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোট দাবি করছে।
ঐকমত্য কমিশন সুপারিশ জমা দেয়ার পরপরই নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করেছে বিএনপি। এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের আগে প্রস্তাবিত গণভোট অনুষ্ঠান সম্ভব নয়। সময় স্বল্পতা ও নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য বিপুল অঙ্কের ব্যয় এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ ব্যাপক লোকবল নিয়োগ এবং একটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের মতো বিশাল আয়োজনের বিবেচনায় নির্বাচনের আগে গণভোট অনুষ্ঠান অপ্রয়োজনীয়, অযৌক্তিক ও অবিবেচনাপ্রসূত। একই আয়োজনে এবং একই ব্যয়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনই গণভোট অনুষ্ঠান করা বাঞ্ছনীয়।
জুলাই সনদের সুপারিশে রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত, ভিন্নমত, নোট অব ডিসেন্ট উল্লেখ করা হয়নি জানিয়ে তিনি বলেন, ঐকমত্য কমিশনের প্রস্তাব ও সুপারিশ একপেশে। জবরদস্তিমূলকভাবে তা জাতির ওপরে চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। তাহলে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, দীর্ঘ প্রায় এক বছরব্যাপী সংস্কার কমিশন ও জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর ধারাবাহিক আলোচনা ছিল অর্থহীন। অর্থ ও সময়ের অপচয়, প্রহসনমূলক ও জাতির সাথে প্রতারণা।
রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রায় বছরব্যাপী ধারাবাহিক বৈঠকের পর যখন ঐকমত্য কমিশন সুপারিশ জমা দিলো, সেই সুপারিশের কারণে বরং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আরো মতভিন্নতা ও বিরোধ সৃষ্টি হয়েছে। আর রাজনৈতিক দলগুলোর এই মতভিন্নতা নিরসনে অন্তর্বর্তী সরকার আর কোনো উদ্যোগ নেবে না বলে জানিয়েছেন আইন উপদেষ্টা প্রফেসর আসিফ নজরুল। তিনি বলেন, এখন রাজনৈতিক দলগুলোকেই নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে মতৈক্যে পৌঁছাতে হবে। এ জন্য এক সপ্তাহ সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। গত সোমবার থেকে দেয়া সাত দিনের সময়সীমা শেষ হবে আগামীকাল। কিন্তু এরই মধ্যে গত বৃহস্পতিবার জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে আটটি রাজনৈতিক দল সরকারকে চাপে রাখতে রাজধানীতে কর্মসূচি পালন করে। সেই কর্মসূচিতে জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের হুঙ্কার দিয়ে বলেন, আমরা এখনো নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় আন্দোলনে আছি। সোজা আঙুলে যদি ঘি না উঠে তাহলে আঙুল বাঁকা করব। কিন্তু ঘি আমাদের লাগবেই। সুতরাং যা বোঝাতে চাই বুঝে নিন। নো হাংকি পাংকি। জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোট লাগবেই।
জামায়াতের এই হুঙ্কার ও অন্তর্বর্তী সরকারের নাটকীয় ভূমিকার বিষয়ে হুঁশিয়ারি দিয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, বিএনপিকে অবজ্ঞা করলে ফল ভালো হবে না। বিএনপি ভেসে আসা দল নয়। বিএনপিকে খাটো করে দেখবেন না। আমাদের মাঠে নামতে বাধ্য করবেন না। আমরা যদি মাঠে নামি তবে টিকতে পারবেন না। আমরা মাঠে নামলে রাজনৈতিক বিষয়গুলো ভিন্নভাবে আসবে।
তিনি বলেন, অনেক শিশু ও সাধারণ মানুষের রক্তের বিনিময়ে ফ্যাসিবাদের পতন ঘটেছে। যারা আবার সেই অন্ধকারে ফেরার চক্রান্ত করছে, তাদের মনে রাখা উচিত বিএনপি ভেসে আসা কোনো দল নয়। হামলা-মামলা, কারাভোগ ও আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে বিএনপি আজকের অবস্থানে এসেছে। বিএনপি জনগণের দল। দয়া করে পানি ঘোলা করবেন না, দেশকে অস্থিতিশীল করবেন না এবং নৈরাজ্য শুরু করবেন না। বিএনপি রাস্তায় নামলে পরিস্থিতি ভিন্ন রূপ নেবে।
এদিকে গত বৃহস্পতিবার রাতে স্থায়ী কমিটির সভায় বিএনপি জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে দীর্ঘ আলোচনার পর গৃহীত সিদ্ধান্ত ও গত ১৭ অক্টোবর জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় স্বাক্ষরিত ‘জুলাই জাতীয় সনদ’-এর প্রতি বিএনপি তাদের পূর্ণ সমর্থন ও অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে। সভার পর এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে বিস্তারিত আলোচনা শেষে কতিপয় বিষয়ে নোট অব ডিসেন্টসহ যে সব বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং যা ঐতিহাসিক আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে স্বাক্ষরিত হয়েছে, আমরা তার অংশীদার হিসেবে সনদে বর্ণিত সব বিষয়কে ধারণ করি এবং দেশের সংবিধান ও প্রচলিত আইন অনুযায়ী তা বাস্তবায়নে অঙ্গীকারবদ্ধ।
স্থায়ী কমিটির সভায় বলা হয়, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে নতুন কোনো প্রশ্ন বা সংকট সৃষ্টির সব অপপ্রয়াসের বিরুদ্ধে বিএনপি গণতন্ত্রকামী জনগণের শক্তিকে ধারণ করে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার সংগ্রাম অব্যাহত রাখবে। সভায় ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের সীমাহীন ত্যাগের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানানো হয়।
বিএনপি আশা প্রকাশ করে, দীর্ঘ আলোচনার মাধ্যমে অর্জিত ঐকমত্য বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সব রাজনৈতিক দল ঐক্যবদ্ধ থাকবে এবং গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আয়োজিতব্য নির্বাচনে কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে না।
সভায় আরো বলা হয়, জুলাই জাতীয় সনদের আলোকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আইনানুগ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করবে এবং যথাসময়ে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে, এই প্রত্যাশা বিএনপি ব্যক্ত করছে।
স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, গণভোট ইস্যুতে বিএনপি তার অবস্থান স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছে। এর বাইরে আর বলার কিছুই নেই। এখন সরকার যদি মনে করে বিএনপির কাছ থেকে কোনো সহযোগিতা প্রয়োজন, সরকার যদি সহযোগিতা চায় তখন বিএনপি সহযোগিতা করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। তবে সংসদ নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে অনুষ্ঠানের বিষয়ে অবস্থান অপরিবর্তিত থাকবে।